হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে ইরান। তবে শুধু এই চুক্তি হলেই গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে তেহরান। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় আরও একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন রুট নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার এই প্রণালি বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর পর প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, নতুন একটি নৌপথ চালুর বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘খুব কাছাকাছি’ পর্যায়ে রয়েছে। তবে হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আরও কয়েকটি শর্তের ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ প্রদান।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাকার জোলকদর আরও কয়েকটি শর্তের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও আগ্রাসন বন্ধ করা, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে ইরানের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করা, ইরানের ওপর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।
ওমানও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সময় একাধিক হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে এসব হামলার জন্য কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করেনি দেশটি। ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ভাবে এগোচ্ছে।
তবে ওমান সতর্ক করে বলেছে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা চলমান আলোচনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে বা এখন পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি নষ্ট করে দিতে পারে।
আরাঘচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে আগে যে ‘শিপিং ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম’ চালু ছিল, তা এখন তেহরানের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। স্থায়ী একটি নৌপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রে কারিগরি ও আইনি বিষয়গুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ওমানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী রুট নিয়ে আলোচনা চলছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও দ্রুত সমঝোতার পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটি চুক্তির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। ইরানি সংবাদ সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দেশে এখন ঐক্য, শক্তি ও সংহতি রয়েছে এবং যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইরানকে বিজয়ী ও শক্তিশালী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইউএই জানিয়েছে, দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস বা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, একটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে আগুন ধরে যায়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। ঘটনায় পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে শুক্রবার এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন আশা করছে ইরান ও ওমানের মধ্যে শিগগিরই একটি সমঝোতা হবে এবং এর মাধ্যমে স্বাভাবিক তেল পরিবহন আবার শুরু হতে পারে। ওই কর্মকর্তা বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাহীনভাবে পুনরায় শুরু করার চুক্তি ঘোষণা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নেবে। তবে ইরান তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে কি না, তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নির্ভর করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বর্তমান অবরোধ শুরুর পর মানবিক সহায়তা নিয়ে ৩০টির বেশি জাহাজকে হরমুজ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ৫৩টি জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়া, দুটি জাহাজ অকার্যকর করে দেওয়া এবং আরও দুটি জাহাজে ওঠার কথা জানিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
ইরানে সংঘাত শুরুর পর খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান মৌলিক পণ্য আমদানিতে সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন। তবে মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজের জন্য কোনো বিশেষ ছাড়ের কথা তিনি উল্লেখ করেননি।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টি মূলত ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের শর্ত মেনে নেওয়ার ওপর নির্ভর করছে। বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে নিলেই হরমুজ প্রণালি নিশ্চিতভাবে খুলে দেওয়া হবে। তার দাবি, প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি ইরান-ওমান আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

স্বাধীনতা নিউজ ডেস্ক : 




















