ঢাকা , শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাকে বাঁচাতে পুড়ে মরলেন ছেলেও

৬০ বছর বয়সী সুনীতা গুপ্ত হাঁটতে পারতেন না। দিল্লি থেকে মহোবা যাচ্ছিলেন সুনীতা। সঙ্গে ছিলেন তার ছেলে শশাঙ্ক। তারা বসেছিলেন বাসের একদম পেছনে। বুধবার মধ্যরাতে যখন বাসটিতে আগুন লেগে যায় অনেকেই লাফিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। শশাঙ্কও চাইলে হয়তো বাঁচতে পারতেন।   কিন্তু পঙ্গু মাকে ফেলে নিজে বাঁচার কথা ভাবেননি শশাঙ্ক। চালক যখন যাত্রীদের বাস থেকে নেমে যাওয়ার কথা বলে, তখন শশাঙ্ক তার মাকে গাড়ি থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মায়ের চলাফেরা করার সমস্যার কারণে তাকে সময়মতো নামিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে মা ও ছেলে উভয়েই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং আগুনে গুরুতরভাবে পুড়ে যান। তাদের দেহ এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে, ডিএনএ পরীক্ষা এবং পরিবারের সদস্যদের চেনা কিছু শারীরিক গঠন দেখেই কেবল তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। সুনীতা গুপ্তের স্বামী নীরজ গুপ্ত বিজেপির মহোবা জেলার কোষাধ্যক্ষ। পরিবারটি চরখারি শহরের রাজমন্দির এলাকায় বাস করত। এই মৃত্যুর খবর পেয়ে সাবেক সংসদ সদস্য পুষ্পেন্দ্র সিং চন্দেলসহ বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা নিহতের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে তাদের বাড়িতে যান। বুধবার মধ্যরাতে চালকের খামখেয়ালির কারণে বাসটিতে আগুন লেগে যায়। তাতে ৯ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। বুধবার রাতে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে দিল্লির কাশ্মির গেট থেকে মহোবার উদ্দেশে ছেড়ে যায় বাসটি। রাত ১১টার দিকে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের গ্রেটার নয়ডার জেওয়ার থানা এলাকায় বাসটিতে আগুন লেগে যায়। বাসের যাত্রীরা জানিয়েছেন, আগুন লাগার কয়েক মিনিট আগেই তারা চালককে পোড়া গন্ধের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, যাত্রীরা এর আগে বাসের ভেতরে চালক এবং হেল্পারের ধূমপান করা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা দুজনই এই অভিযোগ হেসেই উড়িয়ে দেন এবং যাত্রীদের চুপ থাকতে বলেন। এরপর চলন্ত বাসের ভেতর পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে যাত্রীরা চালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। চালক ও হেল্পার তাদের এই আশঙ্কাকে পাত্তাই দেননি এবং বলেন যে এমন গন্ধ এই বাসে তারা প্রায়ই পেয়ে থাকেন। যাত্রীদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও চালক গাড়িটি পরীক্ষা না করেই ধূমপান চালিয়ে যান। এর কয়েক মিনিট পরই বাসের সামনের অংশ থেকে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। যাত্রীরা চিৎকার শুরু করলে চালক তাদের উদ্দেশ্য করে বলে, ‘তোমরা মরলে মরো, আমি বাস থামাব না’। মুহূর্তের মধ্যেই বাসটি আগুনে পুরোপুরি গ্রাস করে নেয় এবং ঘন ধোঁয়ার কারণে যাত্রীদের পক্ষে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলের কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন আগুন নেভানো এবং যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন, ততক্ষণে বাসটি পুড়ে একদম কয়লা হয়ে গেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বাসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ সিস্টেমে একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তীতে ইঞ্জিনের লুব্রিকেন্টিং অয়েল বা মবিলকে জ্বালিয়ে দেয় এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাসের চালক ও হেল্পার দুজনই অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গেছেন। পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। বিহারের রেজিস্ট্রেশনভুক্ত বাসটির নথিপত্র তদন্ত করে দেখা গেছে যে, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য এর আগে বাসটির বিরুদ্ধে ৬০ বারেরও বেশি জরিমানা করা হয়েছিল, যার মধ্যে ২০টি জরিমানার টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
জনপ্রিয় সংবাদ

মাকে বাঁচাতে পুড়ে মরলেন ছেলেও

আপডেট সময় ২৫ মিনিট আগে
৬০ বছর বয়সী সুনীতা গুপ্ত হাঁটতে পারতেন না। দিল্লি থেকে মহোবা যাচ্ছিলেন সুনীতা। সঙ্গে ছিলেন তার ছেলে শশাঙ্ক। তারা বসেছিলেন বাসের একদম পেছনে। বুধবার মধ্যরাতে যখন বাসটিতে আগুন লেগে যায় অনেকেই লাফিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। শশাঙ্কও চাইলে হয়তো বাঁচতে পারতেন।   কিন্তু পঙ্গু মাকে ফেলে নিজে বাঁচার কথা ভাবেননি শশাঙ্ক। চালক যখন যাত্রীদের বাস থেকে নেমে যাওয়ার কথা বলে, তখন শশাঙ্ক তার মাকে গাড়ি থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মায়ের চলাফেরা করার সমস্যার কারণে তাকে সময়মতো নামিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে মা ও ছেলে উভয়েই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং আগুনে গুরুতরভাবে পুড়ে যান। তাদের দেহ এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে, ডিএনএ পরীক্ষা এবং পরিবারের সদস্যদের চেনা কিছু শারীরিক গঠন দেখেই কেবল তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। সুনীতা গুপ্তের স্বামী নীরজ গুপ্ত বিজেপির মহোবা জেলার কোষাধ্যক্ষ। পরিবারটি চরখারি শহরের রাজমন্দির এলাকায় বাস করত। এই মৃত্যুর খবর পেয়ে সাবেক সংসদ সদস্য পুষ্পেন্দ্র সিং চন্দেলসহ বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা নিহতের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে তাদের বাড়িতে যান। বুধবার মধ্যরাতে চালকের খামখেয়ালির কারণে বাসটিতে আগুন লেগে যায়। তাতে ৯ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। বুধবার রাতে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে দিল্লির কাশ্মির গেট থেকে মহোবার উদ্দেশে ছেড়ে যায় বাসটি। রাত ১১টার দিকে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের গ্রেটার নয়ডার জেওয়ার থানা এলাকায় বাসটিতে আগুন লেগে যায়। বাসের যাত্রীরা জানিয়েছেন, আগুন লাগার কয়েক মিনিট আগেই তারা চালককে পোড়া গন্ধের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, যাত্রীরা এর আগে বাসের ভেতরে চালক এবং হেল্পারের ধূমপান করা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা দুজনই এই অভিযোগ হেসেই উড়িয়ে দেন এবং যাত্রীদের চুপ থাকতে বলেন। এরপর চলন্ত বাসের ভেতর পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে যাত্রীরা চালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। চালক ও হেল্পার তাদের এই আশঙ্কাকে পাত্তাই দেননি এবং বলেন যে এমন গন্ধ এই বাসে তারা প্রায়ই পেয়ে থাকেন। যাত্রীদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও চালক গাড়িটি পরীক্ষা না করেই ধূমপান চালিয়ে যান। এর কয়েক মিনিট পরই বাসের সামনের অংশ থেকে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। যাত্রীরা চিৎকার শুরু করলে চালক তাদের উদ্দেশ্য করে বলে, ‘তোমরা মরলে মরো, আমি বাস থামাব না’। মুহূর্তের মধ্যেই বাসটি আগুনে পুরোপুরি গ্রাস করে নেয় এবং ঘন ধোঁয়ার কারণে যাত্রীদের পক্ষে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলের কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন আগুন নেভানো এবং যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন, ততক্ষণে বাসটি পুড়ে একদম কয়লা হয়ে গেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বাসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ সিস্টেমে একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তীতে ইঞ্জিনের লুব্রিকেন্টিং অয়েল বা মবিলকে জ্বালিয়ে দেয় এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাসের চালক ও হেল্পার দুজনই অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গেছেন। পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। বিহারের রেজিস্ট্রেশনভুক্ত বাসটির নথিপত্র তদন্ত করে দেখা গেছে যে, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য এর আগে বাসটির বিরুদ্ধে ৬০ বারেরও বেশি জরিমানা করা হয়েছিল, যার মধ্যে ২০টি জরিমানার টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি।