ঢাকা , রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেত্রকোনায় বজ্রাঘাতে ৭ মাসে প্রাণ হারাল ১৩ জন

বর্ষার সময় এলেই নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলজুড়ে নেমে আসে বজ্রপাতের আতঙ্ক। ভয়ে দিন পার করে এই অঞ্চলের প্রান্তিক জনপদের মানুষ।
গত ৭ মাসে অঞ্চলটিতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩ জন।এ ছাড়া গত সাড়ে পাঁচ বছরে বজ্রপাতের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬০ জন। জেলা পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বজ্রপাতে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৫ জন, ২০২৫ সালে ১২ জন এবং চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। বজ্রঘাতে নিহতদের বেশির ভাগই কৃষক, জেলে ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ।
জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনই তাদের বাধ্য হয়ে বজ্রপাত আতঙ্ক মাথায় নিয়েই নামতে হয় খোলা মাঠ, বিল ও হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। ফলে বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকারও হচ্ছেন তারাই। জেলার খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, পূর্বধলা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোরের বৃষ্টিতে বাড়ির পাশের জমিতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক রাজিব মিয়া (২৪)।
পরিবারের জন্য মাছ নিয়ে ফিরবেন এমন আশা ছিল তার। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হয়নি। হঠাৎ আকাশ চিরে নেমে আসা বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। ১৮ জুন একই দিনে কেন্দুয়া উপজেলার মোড়াইল বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান শামসুল হুদা (৫৫) এবং সান্দিকোনা এলাকায় প্রাণ হারান আশরাফুল ইসলাম (২৫)। এক দিনে তিনজনের মৃত্যুতে শোক নেমে আসে পরিবারগুলোতে।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে এলাকা।
খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক সামছুল হক বলেন, ‘হাওরে কাজ করতে গেলে আকাশের অবস্থা সব সময় বোঝা যায় না। অনেক সময় হঠাৎ মেঘ করে বজ্রপাত শুরু হয়। আশপাশে কোনো ঘর বা নিরাপদ জায়গা না থাকায় আতঙ্কের মধ্যেই থাকতে হয়।’ এ ছাড়া জেলেদেরও একই অভিজ্ঞতা। মাছ ধরার সময় বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হলে নৌকা নিয়েই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় তাদের। নেত্রকোনা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মো. মামুন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে এবং বজ্রমেঘ সৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর প্রভাব রয়েছে। বজ্রপাত মূলত ‘কিউমুলোনিম্বাস’ বা সিবি মেঘ থেকে সৃষ্টি হয়। এখন নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমে গেছে। তাই হাওর এলাকায় তালগাছসহ উঁচু গাছ লাগানোর উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, হাওরের বিশাল এলাকায় শুধু বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। খোলা মাঠে কৃষক ও জেলেদের জন্য বিশেষ শেল্টার জোন বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র প্রয়োজন যেখানে আকস্মিক দুর্যোগের সময় কৃষক ও জেলেরা দ্রুত নিরাপদে যেতে পারবেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবগত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আশ্রয়কেন্দ্রে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা ছাড়াও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর কারিগরি দিক ও স্থান নির্বাচন করতে মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞদল সরেজমিন পরিদর্শন করবে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
জনপ্রিয় সংবাদ

নেত্রকোনায় বজ্রাঘাতে ৭ মাসে প্রাণ হারাল ১৩ জন

আপডেট সময় ১১:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
বর্ষার সময় এলেই নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলজুড়ে নেমে আসে বজ্রপাতের আতঙ্ক। ভয়ে দিন পার করে এই অঞ্চলের প্রান্তিক জনপদের মানুষ।
গত ৭ মাসে অঞ্চলটিতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩ জন।এ ছাড়া গত সাড়ে পাঁচ বছরে বজ্রপাতের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬০ জন। জেলা পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বজ্রপাতে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৫ জন, ২০২৫ সালে ১২ জন এবং চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। বজ্রঘাতে নিহতদের বেশির ভাগই কৃষক, জেলে ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ।
জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনই তাদের বাধ্য হয়ে বজ্রপাত আতঙ্ক মাথায় নিয়েই নামতে হয় খোলা মাঠ, বিল ও হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। ফলে বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকারও হচ্ছেন তারাই। জেলার খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, পূর্বধলা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোরের বৃষ্টিতে বাড়ির পাশের জমিতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক রাজিব মিয়া (২৪)।
পরিবারের জন্য মাছ নিয়ে ফিরবেন এমন আশা ছিল তার। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হয়নি। হঠাৎ আকাশ চিরে নেমে আসা বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। ১৮ জুন একই দিনে কেন্দুয়া উপজেলার মোড়াইল বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান শামসুল হুদা (৫৫) এবং সান্দিকোনা এলাকায় প্রাণ হারান আশরাফুল ইসলাম (২৫)। এক দিনে তিনজনের মৃত্যুতে শোক নেমে আসে পরিবারগুলোতে।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে এলাকা।
খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক সামছুল হক বলেন, ‘হাওরে কাজ করতে গেলে আকাশের অবস্থা সব সময় বোঝা যায় না। অনেক সময় হঠাৎ মেঘ করে বজ্রপাত শুরু হয়। আশপাশে কোনো ঘর বা নিরাপদ জায়গা না থাকায় আতঙ্কের মধ্যেই থাকতে হয়।’ এ ছাড়া জেলেদেরও একই অভিজ্ঞতা। মাছ ধরার সময় বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হলে নৌকা নিয়েই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় তাদের। নেত্রকোনা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মো. মামুন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে এবং বজ্রমেঘ সৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর প্রভাব রয়েছে। বজ্রপাত মূলত ‘কিউমুলোনিম্বাস’ বা সিবি মেঘ থেকে সৃষ্টি হয়। এখন নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমে গেছে। তাই হাওর এলাকায় তালগাছসহ উঁচু গাছ লাগানোর উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, হাওরের বিশাল এলাকায় শুধু বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। খোলা মাঠে কৃষক ও জেলেদের জন্য বিশেষ শেল্টার জোন বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র প্রয়োজন যেখানে আকস্মিক দুর্যোগের সময় কৃষক ও জেলেরা দ্রুত নিরাপদে যেতে পারবেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবগত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আশ্রয়কেন্দ্রে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা ছাড়াও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর কারিগরি দিক ও স্থান নির্বাচন করতে মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞদল সরেজমিন পরিদর্শন করবে।