ঢাকা
,
রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
এনসিপি বলতে কিছু নেই, যা আছে তা জামায়াতের শিশু সংগঠন: রাশেদ খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ধীরগতিতে টানা ভোগান্তি
সরকারে যুক্ত হচ্ছেন শরিকরা
পরিহার করতে হবে পুরোনো ধারার রাজনীতি
যুক্তরাষ্ট্রে এক মাসে রেকর্ড ৫১ হাজার অভিবাসী গ্রেফতার
অনলাইন জুয়ায় ডুবছে দেশ
সিলেটে বাস দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার পাবে ৫ লাখ টাকা
যুক্তরাষ্ট্রে এক মাসে ৫১ হাজার অভিবাসী আটক
জুলাই যোদ্ধাদের সিএনজি-অটোরিকশা-রিকশা উপহার দিলেন প্রধানমন্ত্রী
প্রেমিকাকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ, অস্বীকার ইনফান্তিনোর
নতুন বন্দোবস্ত নাকি পুরনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি
-
স্বাধীনতা নিউজ ডেস্ক : - আপডেট সময় ০১:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
- ৬ বার পড়া হয়েছে
’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘটনা হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। আর গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বে তৈরি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান তাতে বাড়তি মাত্রা যোগ করে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দলীয়করণ, পরিবারতন্ত্র, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে নতুন বন্দোবস্তের ডাক দিয়েছিলেন তরুণ নেতারা। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কিন্তু দেড় বছরের পথচলায় এনসিপির রাজনৈতিক-সংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও নেতাদের কার্যক্রম নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। যা নিয়ে দেশের রাজনীতি সচেতন মহলে প্রশ্নে তোলেন আসলেই এনসিপি নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি করছে, নাকি সেই পুরনো রাজনীতিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে?
আত্মপ্রকাশের দিন এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, এটি কেবল আরেকটি রাজনৈতিক দল নয়; বরং বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা। তার ভাষায়, দেশের মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। সেই পরিবর্তনের রাজনীতিকেই ধারণ করবে জুলাই অভ্যত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া এনসিপি। একই সঙ্গে দল পরিচালনায় অর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথাও বলেছিলেন তিনি। দলটির ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার কণ্ঠে উচ্চারিত ‘তুমি কে, আমি কে, বিকল্প, বিকল্প’ স্লোগানই নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠনের অনুপ্রেরণা। দলটির নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারা এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলবেন যেখানে বৈষম্য, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও বিশেষ সুবিধাভোগী রাজনীতির কোনো স্থান থাকবে না। সংবিধান সংস্কার, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য।
প্রতিষ্ঠার এক বছর পাঁচ মাসের মধ্যে এনসিপি জাতীয় সংসদে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে ছাত্রদের দ্বারা গঠিত দলটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি ভোট পেয়েছে ২২ লাখ ৬৯ হাজার ৬৩১টি, যা মোট ভোটের ৩.২১ শতাংশ। জাতীয় সংসদে দলটির ছয়জন সরাসরি নির্বাচিত এবং দুটি সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট আটজন সদস্য রয়েছেন। এই সংখ্যা ক্ষুদ্র হলে রাজনীতির মাঠে বার্তা দিতে পেরেছে এনসিপি। তবে এককভাবে নয়, জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের অংশ হওয়ার মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনে এই ফল পেয়েছে দলটি। যা দলটির রাজনৈতিক কৌশল ও সংগঠনিক দুর্বল দিক প্রকাশ করে। কারণ এই জোট ঘোষণাকে কেন্দ্র করে অনেক নেতা এনসিপি থেকে বেরিয়ে যান।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি নতুন দলের জন্য সংসদে প্রবেশ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, বিকল্প ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ, জোট রাজনীতির বাস্তবতায় সেই স্বাতন্ত্র্য অনেকটা ক্ষুণ্ন করেছে। এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার আমাদের সময়কে বলেন, জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক সমঝোতা ও সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা বাস্তব রাজনীতির অংশ। ১১ দলীয় জোটে থাকা মানেই আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে আসা নয়। বরং সংসদের ভেতর থেকেই সংস্কার, জবাবদিহি ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রাজনীতি এগিয়ে নিতে চায় এনসিপি।
এদিকে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী সম্প্রতি বলেন, দেশের মানুষ এখন আর শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন চায় না; তারা পুরো সিস্টেমের পরিবর্তন চায়। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক ও সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবায় অগ্রাধিকার পাবেন। আঞ্চলিক পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতের কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না। যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছেন, তাদের সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে গত বুধবার দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য বিচার, সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক উদ্যোগ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন সংবিধান প্রণয়নের পরিবর্তে সংশোধনের পথে হাঁটা হচ্ছে।
রাজনীতিতে নতুনের বার্তা দেওয়া দলটির কয়েকজন নেতাকে ঘিরে সম্প্রতি সৃষ্টি হওয়া বিতর্কও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদকে নেওয়ার জন্য মাঝ নদী থেকে ফেরি ফিরিয়ে আনার ঘটনা ঘটেছে। গত ১১ জুলাই বিকালে নোয়াখালীর চেয়ারম্যান ঘাট থেকে নলচিরা ঘাটের উদ্দেশে ফেরি ছেড়ে যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে প্রায় ২০ মিনিট চলার পর ফেরি ঘুরে আসায় সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রশ্ন ওঠে, জনগণের সুবিধার জন্য পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় সেবা কি কোনো জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করা উচিত? ঘটনাটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা সে প্রশ্ন হাজির হয়েছে। এ বিষয়ে গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ আমাদের সময়কে বলেন, এনসিপি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বললেও বাস্তবে তাদের অনেক নেতার আচরণে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখছি। সম্প্রতি ধরা পড়া এক জঙ্গি তাদের দলের। এ ছাড়া পতিত সরকারের লোকদের এনসিপিতে সম্পৃক্ত করছে। এতে করে জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বিএনপি নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খান দাবি করেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের কারণেই স্বয়ং জামায়াতের আমির ঢাকা-১০ আসন ছাড়েননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকরা এ বিষয়ে জামায়াতের আমিরকে প্রশ্ন করলে প্রকৃত তথ্য জানতে পারবেন। বহুল আলোচিত ডিসি কেলেঙ্কারির তথ্যও অসত্য নয় এবং এতে হাসনাত ও সারজিস জড়িত ছিলেন। এনসিপির শীর্ষ এক ডজন নেতা ব্যাপক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি সারজিসের কাছে এক নারীর ৭ লাখ টাকা দেওয়ার ভিডিওর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারী অভিযোগ করেছিলেন, চাকরি বা কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে মোট ৪৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল।
এসব অভিযোগের বিষয়ে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার আমাদের সময়কে বলনে, অনকেটা নিরুপায় হয়েই হান্নান মাসুদকে ফেরি ঘোরাতে হয়েছিল। তিনি নিজেই মনে করেছেন কাজটি ঠিক হয়নি। এমনটা যেন ভবিৎষ্যতে আর না হয়- সেদিকে দলের সব পর্যায়ের নেতাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দলকে মূল্যায়ন করা উচতি নয়। তার মতে, দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন সম্প্রসারণ, তৃণমূলভিত্তিক নেতৃত্ব¡ তৈরি, নারী নেতৃত্বের বিকাশ এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত রয়েছে। যেন ভবিষ্যতে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশের জনগণ অতীতে বহুবার নতুন দল ও নতুন প্রতিশ্রুতির সাক্ষী হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ দলই প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে থাকতে পারেনি। ফলে এনসিপির ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে- তারা কি নিজেদের ঘোষিত আদর্শ অনুযায়ী স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, রাজনৈতিক শালীনতা এবং ক্ষমতার সংযত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে, নাকি প্রচলিত রাজনীতির একই চক্রে আটকে যাবে। তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আবেগ এখন ধীরে ধীরে বাস্তব রাজনীতির পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে। সেই পরীক্ষায় এনসিপি একদিকে জনগণের উচ্চ প্রত্যাশার ভার বহন করছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি শুধু বক্তৃতা বা স্লোগানে নয়, বরং বাস্তব কর্মকাণ্ডে কতটা প্রতিফলিত হয়।
ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ























