নব্বইয়ের দশকে দেশের তৈরি পোশাক ও স্পিনিং শিল্পে যখন জোয়ার বইছিল, সেই পালে হাওয়া লাগিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সোনারগাঁও টেক্সটাইল লিমিটেড। সরকারের কর অব্যাহতি, শুল্ক সুবিধা আর নগদ সহায়তার ওপর ভর করে এক সময় যে প্রতিষ্ঠানটি সাফল্যের চূড়ায় ছিল, তিন দশক পর সেই কোম্পানিটিই এখন ডুবছে পুঞ্জীভূত লোকসানের ভারে। এক সময়ের লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম এখন গভীর অনিশ্চয়তায়।
স্থানীয় ও রপ্তানিমুখী বাজারে সুতার চাহিদা মেটাতে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সোনারগাঁও টেক্সটাইলস। খান সন্স গ্রুপের এই উদ্যোগে অর্থায়ন করেছিল তৎকালীন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক। ১৯৯২ সালে একটি ইউনিটের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে কোম্পানিটি। শুরুর দিকে পর্ষদের নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান এ কে এম আজিজুর রহমান। পর্ষদে আরও ছিলেন রোজি রহমান, বজলুর রহমান, মো. ফজলুর রহমান এবং আইসিবি ও শিল্প ব্যাংকের প্রতিনিধিরা।
বরিশাল অঞ্চলে স্থাপিত এই কারখানাটি ৪০ থেকে ৬০ কাউন্টের সুতি সুতা এবং ৪৫ থেকে ৮২ কাউন্টের পলিয়েস্টার সুতা উৎপাদনে সক্ষম ছিল। ১৪ হাজার ৪০০ স্পিন্ডল নিয়ে শুরু করা এই কারখানার সব কাঁচামাল আমদানি করা হতো বিদেশ থেকে।
১৯৯৩ সালে মাত্র ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা আয় করে প্রতিষ্ঠানটি। সে বছর নিট মুনাফা ছিল ১৫ লাখ টাকা। তবে পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে চিত্র বদলে যায়। মাত্র ১০ মাসেই মুনাফা ৬ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯০ লাখ টাকায়। এমন উজ্জ্বল আর্থিক চিত্র নিয়ে ১৯৯৫ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি।
আইপিওর মাধ্যমে ২ লাখ ৪৮ হাজার শেয়ার ছেড়ে ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সংগ্রহ করে তারা, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঋণ পরিশোধ ও মূলধন শক্তিশালী করা। বিনিয়োগকারীদের বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিল সোনারগাঁও টেক্সটাইল। পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল যে ১৯৯৯ সালে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ৫৩ টাকায় পৌঁছাবে এবং নিয়মিত ২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হবে। ১৯৯৬ সালে এটি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) তালিকাভুক্ত হয়।
তালিকাভুক্তির পর থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সময়কালকে কোম্পানিটির ‘সোনালি অধ্যায়’ বলা যায়। এই সময়ে বিক্রি ২০ কোটি থেকে বেড়ে ৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়। কর্মসংস্থানও বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৫০ জনে। ২০১১ সালে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে ১: ১ অনুপাতে রাইট শেয়ার ইস্যু করে ১৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করে কোম্পানিটি। প্রতিটি ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার ৫০ টাকা অতিরিক্ত (প্রিমিয়াম) যোগ করে মোট ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল।
২০১২ সালের পর থেকে সাফল্যের সেই ধারাবাহিকতা ‘তাসের ঘরের’ মতো ভেঙে পড়ে। ২০১৩ সাল থেকে শুরু হয় টানা লোকসান। ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা কোনো লভ্যাংশ পাননি। ২০১৮-১৯ সালে সামান্য মুনাফায় ফিরলেও পরের বছরই আবার ৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। মূলত বিদ্যুৎ সংকট, শ্রমিকের অভাব এবং বিদেশি সুতার সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতাই কোম্পানিটিকে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী সোনারগাঁও টেক্সটাইলসের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে তিন বছরই বড় লোকসান গুনেছে তারা। সর্বশেষ বছরে ৩২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা আয় করলেও নিট লোকসান হয়েছে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮০ পয়সায়।
লোকসানের পাশাপাশি ঋণের চাপও বেড়েছে। অর্থবছর শেষে কোম্পানির ১২৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার মোট সম্পদের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি দায় ৭৩ কোটি টাকার বেশি। প্রতি ১ টাকা ইক্যুইটির বিপরীতে ঋণ রয়েছে প্রায় ১ টাকা ৫৯ পয়সা। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) কমে ১৮ টাকা ৩৫ পয়সায় নেমেছে এবং কর্মীসংখ্যা এক বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ কমে ১ হাজার ১৪৫ জন থেকে ৮০১ জনে এসেছে।
অন্যদিকে কোম্পানির সঞ্চিত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। চলতি সম্পদের তুলনায় চলতি দায় প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বেশি থাকায় চলতি মূলধনেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কোম্পানির ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা (গোয়িং কনসার্ন) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তার কথা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে ২৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের এ কোম্পানিতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে ৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৮ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ শেয়ার।
কেন এ করুণ দশা? কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মনিরুল ইসলাম খান এ পরিস্থিতির জন্য বিদ্যুৎ খরচকে প্রধান দায়ী করেছেন। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের কারখানাটি সম্পূর্ণ বিদ্যুৎনির্ভর, অথচ অনেক প্রতিযোগীর কারখানা গ্যাসভিত্তিক। বিদ্যুতের দাম কয়েক দফা বাড়ায় আমাদের উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে গেছে।’ তবে আশা ছাড়ছেন না উদ্যোক্তারা। সিএফও জানান, বরিশাল অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনা করে উদ্যোক্তারা প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে লড়ছেন। তাদের আশা, ভোলা থেকে গ্যাস সংযোগ পাওয়া গেলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং কোম্পানিটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।