ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীদের অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান শামা ওবায়েদের রাতে জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী, গড়বেন নতুন ইতিহাস-ব্রিফিংয়ে মাহ্দী আমিন কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশের বড় অভিযান: এক রাতেই আটক ৬২৪ চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে অংশীদার হওয়া উচিত: শি জিনপিং ৫ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে বিজেপির খরচ ৫২৯ কোটি ভয়ংকর সেপ্টেম্বর দেউলিয়া ঘোষণা চান ১৯৭ ঋণখেলাপি কাউন্সিলর একরাম হত্যা : হাসিনা-কাদেরসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানি আজ রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রভাবে সংকটে গরুর মাংসের বাজার

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু জবাইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকরের প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারে। রাজ্যজুড়ে গরুর মাংসের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দাম বেড়েছে, ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও রেস্তোরাঁ মালিকেরা। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যে গরু জবাইসংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে। এতে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ ও সরকারি সনদ ছাড়া গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর এবং নির্দিষ্ট বয়সের মহিষ জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, জবাইয়ের জন্য নির্ধারিত পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি হতে হবে অথবা সেটি কাজ কিংবা প্রজননে অক্ষম হতে হবে। বয়স, আঘাত, শারীরিক ত্রুটি বা নিরাময় অযোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম পশুর ক্ষেত্রেও সনদ দেওয়া যেতে পারে। অনুমোদিত পশু কেবল পৌরসভা বা নির্ধারিত কসাইখানায় জবাই করা যাবে।

ঈদের মাত্র কয়েক দিন আগে এই নির্দেশনা জারি হওয়ায় কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন বাজার ও রেস্তোরাঁয় গরুর মাংসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। তিন মাসেরও বেশি সময় পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

কলকাতার ট্যাংরা এলাকার পৌর কসাইখানাটিও কার্যত অচল হয়ে আছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, পশু জবাইয়ের সনদের পাশাপাশি মাংস বিক্রির লাইসেন্স নবায়নও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুনে কলকাতা পৌর করপোরেশন ভেঙে যাওয়ার পর এসব লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। কলকাতায় এক কেজি গরুর মাংসের দাম এখন ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপি, যা মে মাসের আগে ছিল ২০০ থেকে ২৫০ রুপির মধ্যে। এক প্লেট গরুর মাংসের ভুনার দামও ১০০ থেকে বেড়ে ১২০ রুপি হয়েছে। তবে সরবরাহ ও মান কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

পার্ক সার্কাস এলাকার মাংসের দোকানগুলোর মালিকদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, মে মাসের পর তাদের ব্যবসায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লোকসান হয়েছে। সরবরাহ অনিয়মিত, দাম বেশি এবং মাংসের মানও আগের তুলনায় খারাপ হয়েছে বলে তারা জানান।

এ পরিস্থিতিতে কলকাতার অন্তত এক ডজন রেস্তোরাঁ গত তিন মাসে গরুর মাংসের বিভিন্ন পদ বিক্রি বন্ধ করেছে। শহরের পরিচিত জাম জাম রেস্তোরাঁর তিনটি শাখা থেকেই মানসম্মত মাংসের সরবরাহ না পাওয়ায় সব গরুর মাংসের পদ বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ লোকসান হচ্ছে এবং কর্মীও ছাঁটাই করতে হয়েছে।

১৯৪৭ সাল থেকে কলকাতায় পরিচিত রেস্তোরাঁ ওলিপাবও নিয়মিত গরুর মাংসের স্টেক পরিবেশন করতে পারছে না। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেনু থেকে পদটি বাদ দেওয়া হয়নি, তবে সরবরাহ না থাকায় এটি কেবল মাংস পাওয়া গেলে পরিবেশন করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের অন্যতম গরুর মাংস ভক্ষণকারী রাজ্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ গ্রামীণ ও ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শহুরে পরিবার গরু বা মহিষের মাংস খাওয়ার কথা জানিয়েছে। রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গরুর মাংস খান। খ্রিস্টান, কিছু দলিত ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর প্রচলন রয়েছে।

রাজ্যের মালদা ও বারুইপুরসহ অন্যান্য এলাকাতেও সরবরাহ সংকটের খবর পাওয়া গেছে। বারুইপুরে স্থানীয় বাজারগুলোতে সকাল ১১টার মধ্যেই গরুর মাংস শেষ হয়ে যাচ্ছে, কোনো কোনো দিন একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। মালদায় পরিস্থিতি আরও গোপনীয় হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন পরিচিত কারও মাধ্যমে রাতের বেলায় জবাই করে বাড়িতে মাংস পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

এদিকে গরু জবাইসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নতুন না হলেও বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর প্রয়োগ কঠোর হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি। রাজ্যের কসাইখানা ও লাইসেন্স নবায়নের দায়িত্ব কার, তা নিয়েও সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
জনপ্রিয় সংবাদ

মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রভাবে সংকটে গরুর মাংসের বাজার

আপডেট সময় ০৪:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু জবাইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকরের প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারে। রাজ্যজুড়ে গরুর মাংসের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দাম বেড়েছে, ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও রেস্তোরাঁ মালিকেরা। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যে গরু জবাইসংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে। এতে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ ও সরকারি সনদ ছাড়া গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর এবং নির্দিষ্ট বয়সের মহিষ জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, জবাইয়ের জন্য নির্ধারিত পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি হতে হবে অথবা সেটি কাজ কিংবা প্রজননে অক্ষম হতে হবে। বয়স, আঘাত, শারীরিক ত্রুটি বা নিরাময় অযোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম পশুর ক্ষেত্রেও সনদ দেওয়া যেতে পারে। অনুমোদিত পশু কেবল পৌরসভা বা নির্ধারিত কসাইখানায় জবাই করা যাবে।

ঈদের মাত্র কয়েক দিন আগে এই নির্দেশনা জারি হওয়ায় কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন বাজার ও রেস্তোরাঁয় গরুর মাংসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। তিন মাসেরও বেশি সময় পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

কলকাতার ট্যাংরা এলাকার পৌর কসাইখানাটিও কার্যত অচল হয়ে আছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, পশু জবাইয়ের সনদের পাশাপাশি মাংস বিক্রির লাইসেন্স নবায়নও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুনে কলকাতা পৌর করপোরেশন ভেঙে যাওয়ার পর এসব লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। কলকাতায় এক কেজি গরুর মাংসের দাম এখন ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপি, যা মে মাসের আগে ছিল ২০০ থেকে ২৫০ রুপির মধ্যে। এক প্লেট গরুর মাংসের ভুনার দামও ১০০ থেকে বেড়ে ১২০ রুপি হয়েছে। তবে সরবরাহ ও মান কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

পার্ক সার্কাস এলাকার মাংসের দোকানগুলোর মালিকদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, মে মাসের পর তাদের ব্যবসায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লোকসান হয়েছে। সরবরাহ অনিয়মিত, দাম বেশি এবং মাংসের মানও আগের তুলনায় খারাপ হয়েছে বলে তারা জানান।

এ পরিস্থিতিতে কলকাতার অন্তত এক ডজন রেস্তোরাঁ গত তিন মাসে গরুর মাংসের বিভিন্ন পদ বিক্রি বন্ধ করেছে। শহরের পরিচিত জাম জাম রেস্তোরাঁর তিনটি শাখা থেকেই মানসম্মত মাংসের সরবরাহ না পাওয়ায় সব গরুর মাংসের পদ বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ লোকসান হচ্ছে এবং কর্মীও ছাঁটাই করতে হয়েছে।

১৯৪৭ সাল থেকে কলকাতায় পরিচিত রেস্তোরাঁ ওলিপাবও নিয়মিত গরুর মাংসের স্টেক পরিবেশন করতে পারছে না। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেনু থেকে পদটি বাদ দেওয়া হয়নি, তবে সরবরাহ না থাকায় এটি কেবল মাংস পাওয়া গেলে পরিবেশন করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের অন্যতম গরুর মাংস ভক্ষণকারী রাজ্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ গ্রামীণ ও ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শহুরে পরিবার গরু বা মহিষের মাংস খাওয়ার কথা জানিয়েছে। রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গরুর মাংস খান। খ্রিস্টান, কিছু দলিত ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর প্রচলন রয়েছে।

রাজ্যের মালদা ও বারুইপুরসহ অন্যান্য এলাকাতেও সরবরাহ সংকটের খবর পাওয়া গেছে। বারুইপুরে স্থানীয় বাজারগুলোতে সকাল ১১টার মধ্যেই গরুর মাংস শেষ হয়ে যাচ্ছে, কোনো কোনো দিন একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। মালদায় পরিস্থিতি আরও গোপনীয় হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন পরিচিত কারও মাধ্যমে রাতের বেলায় জবাই করে বাড়িতে মাংস পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

এদিকে গরু জবাইসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নতুন না হলেও বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর প্রয়োগ কঠোর হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি। রাজ্যের কসাইখানা ও লাইসেন্স নবায়নের দায়িত্ব কার, তা নিয়েও সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।